কলের লাঙলের মাধ্যমে মরিয়ম বেগমের জীবনের উন্নতি

মরিয়ম বেগম একজন ভূমিহীন কৃষিজীবী মহিলা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি দুঃসহ জীবনযাপন করছিলেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে, তারা যথাক্রমে চতুর্থ ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তাঁর স্বামী ২৩ বছর বয়সী একজন যুবা কৃষক; তিনি বর্গাচাষী এবং দিন মজুরের কাজ করতেন। তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তাঁর স্বামী একজন দরিদ্র কৃষক এবং তিনি গৃহস্থালি ও স্বামীর কৃষিকাজে সাহায্য করতেন। সিডরে তাঁর কৃষি-সরঞ্জাম, যেমন কোদাল, লাঙল, জোয়াল ইত্যাদি নষ্ট হয়ে যায়। তাঁর স্বামী তখন একেবারে বেকার হয়ে পড়ে। তিনি তখন কি করবেন, কিভাবে বাঁচবেন ভেবে চোখে অন্ধকার দেখেন।

বাঁচার জন্যে তিনি বিভিন্ন বাড়িতে বুয়ার কাজ করতেন আর এলাকায় কাজ না থাকায় তাঁর স্বামী ছিলেন বেকার। এমনকি, ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং স্বামীকেও অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করার মতো কোনো টাকা-পয়সা তাঁর কাছে ছিল না। তিনি ভিওএসডি-র অফিসে গিয়ে একজন কর্মচারীর সঙ্গে সাহায্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং ভিওএসডি জরিপের মাধ্যমে সিডরে তাঁর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনা করে তাঁকে এফকেপির অংশগ্রহণকারী হিসেবে নির্বাচন করে। কৃষি-সরঞ্জামের জন্যে তিনি ভিওএসডি-র কাছ থেকে ২০,০০০.০০ টাকার সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণ করেন। সেই টাকার সঙ্গে আরো টাকা যোগ করে তিনি একটি কলের লাঙল কেনেন। তাঁর স্বামী ভরা মৌসুমে কলের লাঙল নিয়ে প্রকল্প এলাকায় ভাড়াভিত্তিতে জমি চষার কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত হয়ে পড়েন; এবং তাঁর সৌভাগ্য ছিল যে, এলাকায় জমি চাষের জন্যে তিনি অনেক ফরমাশ পান। কলের লাঙল ব্যবহার করে তাঁর স্বামী অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৮০০০.০০ টাকা আয় করেন। সেই লাভ থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে তিনি সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন। কিছু টাকাও সঞ্চয় করেন সে-আয় থেকে। পরের বছর তাঁর স্বামী যাতে কলের লাঙলটি ব্যবহার করতে পারেন সেজন্য সেটির খুব ভালোভাবে যত্ন নেন তিনি। বর্তমানে তিনি ঋণের সব টাকা পরিশোধ করেছেন, জমিয়েছেন ১৫,০০০.০০ টাকা। ভালোভাবে সংসার চালাচ্ছেন। নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে তাঁর ছেলেমেয়ে। ধীরে ধীরে তাঁর আয় বাড়ছে এবং বাড়ছে তাঁর সঞ্চয়ও। তিনি তাঁর ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি একটি কলের লাঙলের মালিক এবং তাঁর স্বামী নিয়মিত জমি চাষ করেন। সুতরাং তাঁদের দারিদ্র্য দূর হয়েছে এবং উন্নতি হয়েছে পরিবারের আর্থিক অবস্থার। গ্রামের লোকেরা এখন তাঁকে সম্মান করে। তাঁর স্বামীও খুব ভালোবাসেন তাঁকে। স্বামী ও সন্তান নিয়ে তিনি এখন সুখী। তাঁকে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে তিনি ভিওএসডি এবং এফকেপি/আইডিবি-র কাছে খুব কৃতজ্ঞ। তিনি অন্য কৃষিজীবী দরিদ্র মহিলাদের জীবনে উন্নতির জন্যে এফকেপি-তে অংশগ্রহণ করতে ভিওএসডি-র সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

আফরোজা ও তাঁর পরিবারের গবাদিপশুপালন পুনরায় শুরু

৩২ বছর বয়সী আফরোজা বেগম একজন দরিদ্র মহিলা এবং তিনি তাঁর স্বামী মোঃ তাজুল ইসলামের সঙ্গে থাকেন। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। দুই ছেলের মধ্যে একজন চতুর্থ শ্রেণি ও অন্যজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। তাঁর মেয়েটি পড়ছে নবম শ্রেণিতে। সাইক্লোন-সিডরে তিনি তাঁর দুধেল গাভীটি হারিয়েছেন। তাঁর স্বামী একজন দিনমজুর, কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে দিনমজুরি করে কোনোমতে জীবন যাপন করেন। আফরোজা গরুর দুধ বিক্রি করে তাঁর স্বামীকে সাহায্য করতেন। সিডরের পর তিনি তাঁর স্বামীকে আর সাহায্য করতে পারতেন না এবং স্বামীর রোজগার দিয়ে কিভাবে সংসার চালাবেন ভেবে পেতেন না, কারণ তিনি সংসারের খরচ চালাতে সক্ষম ছিলেন না। তাঁর এ নাজুক অবস্থা বিবেচনা করে ভিওএসডি তাঁকে সুদমুক্ত ঋণপ্রদানের জন্যে নির্বাচন করে। ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫,০০০.০০ টাকা। ঋণের টাকা দিয়ে তিনি বাছুরসহ একটি দুধেল গাভী কিনলেন। দিনে তিনি ৪কেজি দুধ পান এবং বাজারে বিক্রি করেন প্রতি কেজি ৩৫.০০ টাকায় অর্থাৎ দৈনিক তিনি ১৩০.০০ টাকা আয় করেন। দুধ বিক্রির টাকা দিয়ে কিস্তির মাধ্যমে তিনি ঋণের টাকা পরিশোধ করছেন। নিজের ও সংসারের প্রয়োজনেও তিনি খরচ করেন এ টাকা। আফরোজার এ সাফল্য দেখে গ্রামের অনেকে এখন গাভী পালনের জন্যে এগিয়ে এসেছেন। সুদমুক্ত ঋণপ্রদানের জন্যে আফরোজা ভিওএসডি ও এফকেপি-র কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি এর খুব ভালো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন, কারণ ঋণ পরিশোধের পর তিনি বাছুরসহ একটি গাভীর মালিক হবেন এবং তিনি তখন আরো বেশি উপার্জন করতে পারবেন।

রাজিয়া এবং তার টেইলারিং দোকান

তাঁর এলাকায় সাইক্লোন-সিডর আঘাত হানার পূর্বে রাজিয়া (পিরোজপুর, পটুয়াখালী) পোশাক তৈরির কাজ করে দিনে মাত্র ১৫০.০০-২০০.০০ টাকা উপার্জন করতে গিয়ে খুব কঠোর পরিশ্রম করতেন। সাইক্লোন যখন আঘাত হানে, তাঁর বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি, এমনকি তাঁর আয়ের সামান্য এ উৎসটিও ধ্বংস হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে রাজিয়া যেসব ক্ষুদ্রঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সুদের হার অত্যধিক, সেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন । প্রায় দেড় বছর পর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সাইক্লোন-আইলা যখন আঘাত হানে তখন তাঁর আর্থিক দুরবস্থা আরো বেড়ে যায়। সাইক্লোন-আইলা আঘাত করার পরপরই রাজিয়া সাইক্লোন দুর্গতদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গৃহীত ফায়েল খায়ের কর্মসূচি সর্ম্পকে জানতে পারেন। তাঁর দর্জির ব্যবসায় আবার প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি আবেদন করে ১০,০০০.০০ টাকা পান। বর্তমানে রাজিয়া বাংলাদেশি মুদ্রায় দিনে ৫০০/= থেকে ৬০০/= টাকা বিক্রি করে মাসে প্রায় ৬০০০.০০ টাকা মুনাফা করেন, যা তাঁর সন্তানদের স্কুলে পাঠানো ও সংসারের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে যথেষ্ট।

রহিমার মুরগীর খামার

গ্রামে একটি সফল ব্যবসায় উদ্যোগ কেমন হয় তার একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত রহিমার মুরগির খামার। রহিমা তাঁর পরিবারের সঙ্গে পিরোজপুরে বসবাস করেন। এফকে পুনর্বাসন কর্মসূচির কাছ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০,০০০.০০ টাকা নিয়ে তাঁদের মুরগির খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটি সফল হয়েছে। রহিমা, তাঁর স্বামী (শিক্ষক) ও ছেলের (স্কুলের ছাত্র) সহযোগিতায় এ মুরগির খামারটি পরিচালনা ও পরিচর্যা করেন।

নাসরীন একটি কনক্রিটের বেসিন তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন

২৮ বছর বয়সী নাসরীন স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে পটুয়াখালী জেলার হিতালিয়া গ্রামে বসবাস করেন। সাইক্লোনে তাঁদের গ্রাম আক্রান্ত হলে তাঁর স্বামীর ছোট দোকানটির খুব ক্ষতি হয় এবং তাঁরা অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েন। নাসরীন বাংলাদেশে মুসলিম এইড সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পুনর্বাসন কর্মসূচিতে ২০০৯ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে যোগ দেন। গ্রামে পায়খানার সামগ্রী প্রস্তুত করার কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫,০০০.০০ (২০৫ মার্কিন ডলার) টাকার সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণ করেন। তাঁর কারখানার মাসিক আয় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭,০০০.০০ টাকা (৯৫ মার্কিন ডলার)। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নাসরীন পুনরায় সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন এবং তিনি এখন সুন্দর জীবনযাপন করছেন।